সারমর্ম
একটি আর্টিকেল অনুযায়ী যৌনমিলনের পরে পেঁপে খেলে তা থেকে গর্ভধারণ রোধ করা যায়। এটি থেকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে যে আপনি জন্মনিয়ন্ত্রণের জন্য পেঁপে ব্যবহার করতে পারেন। আমরা এর ফ্যাক্ট চেক করে দেখে জেনেছি এই দাবি অনেকাংশে ভুল।

দাবি
একটি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি নিবন্ধ জন্মনিয়ন্ত্রণের জন্য পেঁপে ব্যবহার করার পরামর্শ দেয়। এই ওয়েবসাইটটি বিভিন্ন স্বাস্থ্য অবস্থার জন্য ঘরে তৈরি প্রতিকার প্রকাশ করে থাকে। এগুলি বেশিরভাগ সময় বিজ্ঞান দ্বারা সমর্থিত নয় এবং শুধুমাত্র উপাখ্যানের উপর ভিত্তি করে।
সত্যানুন্ধান
পেঁপে খাওয়া কি একটি নির্ভরযোগ্য জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি?
না, তা ঠিক নয়। জন্মনিয়ন্ত্রণের জন্য পেঁপে খাওয়া একটি নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি নয়। জন্মনিয়ন্ত্রণের জন্য পেঁপে ব্যবহারের ধারণাটি বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ছাড়াই একটি মিথ। পেঁপেতে থাকে প্যাপেইন এনজাইম। এই এনজাইম প্রোজেস্টেরন হরমোনকে প্রভাবিত করে বলে মনে করা হয়। তবে, গর্ভাবস্থা রোধ করার জন্য এটি প্রজনন প্রক্রিয়া বা রিপ্রোডাআক্টিভ প্রসেসকে যথেষ্ট পরিবর্তন করতে পারে এমন কোনও প্রমাণ নেই।

আমরা গর্ভনিরোধক পদ্ধতি হিসাবে পেঁপের ব্যবহারের বিষয়ে মতামতের জন্য পাটনার ইএসআইসি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের গাইনোকোলজিস্ট ডাঃ সৌম্যার সাথে কথা বলেছি। তিনি বলেছেন, “এই দাবির স্বপক্ষে কোন প্রমাণ নেই। পেঁপেতে প্যাপেইন থাকে, যা হরমোনের কাজে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে বলে মনে করা হয়। কিন্তু, এতে প্যাপেইনের যে পরিমাণ থাকে তা যুক্তিসঙ্গত গর্ভনিরোধক হিসেবে কাজ করার জন্য যথেষ্ট নয়। গর্ভনিরোধক পদ্ধতি হিসাবে পেঁপের ওপর নির্ভর করলে অবাঞ্ছিত গর্ভধারণ এবং স্বাস্থ্যে সম্ভাব্য ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে।“
তিনি আরো বলেন, “তবে, গর্ভাবস্থায় পাকা নয় এমন পেঁপে খাওয়ার সাথে সম্পর্কিত সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলি নিয়ে আলোচনা করা জরুরি। কাঁচা পেঁপেতে অনেক বেশি মাত্রায় প্যাপেইন ও ল্যাটেক্স থাকে যা জরায়ুকে সঙ্কুচিত করতে পারে এবং এতে গর্ভপাত বা সময়ের আগে প্রসবের সম্ভাবনা তৈরি হয়। এছাড়া ল্যাটেক্স থেকে অ্যালার্জি হতে পারে এবং এ থেকে গর্ভাবস্থায় ক্ষতি হতে পারে। তাই, আমি গর্ভবতী মহিলাদের অপরিপক্ক পেঁপে না খাওয়ার পরামর্শ দেব। তার বদলে পাকা পেঁপে খেতে বলব ও তা সীমিত পরিমাণে। পাকা পেঁপেতে প্যাপেইনের পরিমাণ কম থাকে ও সাধারণত একে গর্ভাবস্থায় নিরাপদ বলে মনে করা হয়।“
কেন মানুষ মনে করে যে পেঁপে খেলে গর্ভাবস্থা আটকানো যায়?
কাঁচা বা কম পাকা পেঁপেতে বেশি পরিমাণে প্যাপেইন থাকে, যা প্রজেস্টেরনকে বাধা দেয়। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সেক্স হরমোন যা গর্ভধারণের জন্য জরায়ুকে তৈরি করতে এবং গর্ভাবস্থা বজায় রাখার জন্য দায়ী। আরেকটি তত্ত্ব হতে পারে যে প্যাপেইন, মাংসকে নরম করতে ব্যবহৃত হয়, ভ্রূণের মেমব্রেন তৈরিতে এটি বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
পেঁপে খেলে কি গর্ভধারণ রোধ হয়?
না। গর্ভাবস্থায় পেঁপে খেলে তা কার্যকরীভাবে গর্ভধারণকে রোধ করতে পারে না, কারণ এতে প্রজনন প্রক্রিয়ায় কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় জৈব রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য এবং ঘনত্বের অভাব রয়েছে। পেঁপেতে রয়েছে প্যাপেইন এনজাইম যা প্রজেস্টেরনের মাত্রাকে প্রভাবিত করে বলে মনে করা হয়। কিন্তু এর ঘনত্ব খুব কম যা হরমোনের ভারসাম্য ও প্রজনন প্রক্রিয়াতে বিশেষ প্রভাব ফেলতে পারে না। কার্যকরভাবে গর্ভনিরোধের জন্য এমন পদ্ধতির প্রয়োজন হয় যা নির্ভরযোগ্যভাবে ওভালিউশন, ফার্টিলাইজেশন বা ইমপ্লান্টেশনে বাধা দেয়, যার কোনোটিই পেঁপে করতে পারে না। এছাড়াও পেঁপে একটি গর্ভনিরোধক হিসেবে কাজ করে এমন কোন ডাক্তারি প্রমাণ নেই। এই ধরণের মিথে বিশ্বাস করলে অবাঞ্ছিত গর্ভধারণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই, কার্যকর গর্ভাবস্থা প্রতিরোধের জন্য বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত গর্ভনিরোধক পদ্ধতি ব্যবহার করা এবং স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে জড়িত পেশাদারদের সাথে পরামর্শ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পেঁপেতে কী রয়েছে যা গর্ভাবস্থা প্রতিরোধ করতে পারে বলে মনে করা হয়?
ভারতের মত গ্রীষ্মপ্রধান দেশগুলিতে পেঁপে একটি পুষ্টিকর ফল। পেঁপেতে অনেক রকম বায়োঅ্যাকটিভ কম্পাউন্ড আছে যেমনঃ
১। প্যাপেইনঃ একটি এনজাইম যা প্রজেস্টেরনের মাত্রাকে প্রভাবিত করতে পারে।
২। ফাইটোকেমিকেলঃ ক্যারোটিনয়েড এবং ফ্ল্যাভোনয়েড রয়েছে, যা স্বাস্থ্যের পক্ষে উপকারী কিন্তু গর্ভনিরোধক প্রভাব আছে এমন কোন প্রমাণ নেই।
৩। ভিটামিন ও মিনারেলঃ যেমন ভিটামিন সি ও ফোলেট, যা সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উন্নতিতে কাজ করে কিন্তু গর্ভাবস্থা আটকাতে পারে না।
তা ছাড়াও জন্ম নিয়ন্ত্রণের জন্য পেঁপে খাওয়া নির্ভরযোগ্য এবং কার্যকর নয়। এ নিয়ে খুব সামান্য গবেষণা হয়েছে। যা সামান্য গবেষণা রয়েছে তা করা হয়েছে প্রানীদের নিয়ে বা ল্যাবোরেটরি পরীক্ষায়। আমাদের মানুষের ওপরে আরো গবেষণা চালানো প্রয়োজন যাতে একটি সিদ্ধান্তে আসা যায়। কিন্তু মানুষের ওপর গবেষনায় নৈতিক ও সামাজিক দ্বিধাদ্বন্দ্ব রয়েছে।
গর্ভাবস্থা রোধের প্রমাণিত উপায়গুলি কী কী?
কার্যকর গর্ভনিরোধ নিশ্চিত করা প্রজনন প্রক্রিয়া এবং পরিবার পরিকল্পনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। গর্ভাবস্থা রোধের বিশ্বস্ত পদ্ধতিগুলির মধ্যে রয়েছে:
১। গর্ভনিরোধক বড়িঃ খাওয়ার ওষুধ যা ওভালিউশন আটকায়।
২। কনডোমঃ বাধা দেওয়ার পদ্ধতি যা শুক্রাণুকে ডিম্বাণুর কাছে পৌঁছাতে বাধা দেয়।
৩। ইন্ট্রাইউটেরাইন ডিভাইস (আইইউডি)ঃ জরায়ুর ভেতর একরকমের ডিভাইস ঢুকিয়ে দেওয়া যা ফার্টিলাইজেশন আটকায়।
৪। ইমপ্ল্যান্ট ও ইঞ্জেকশনঃ হরমোন পদ্ধতির প্রয়োগ যা দিয়ে ওভালিউশন রোধ করা হয়।
৫। জরুরী গর্ভনিরোধক (মর্নিং-আফটার পিল): গর্ভাবস্থা রোধ করতে অরক্ষিত যৌন মিলনের পর খেয়ে নেওয়ার বড়ি।
৬। স্টেরিলাইজেশনঃ স্থায়ী পদ্ধতি যেমন মহিলাদের জন্য টিউবাল লাইগেশন বা পুরুষদের জন্য ভ্যাসেকটমি।
গর্ভনিরোধক হিসাবে পেঁপে খেলে কী কী হতে পারে?
গর্ভাবস্থা রোধ করতে পাকা বা কাঁচা পেঁপে খেলে তা থেকে কাজ না হওয়ার জন্য অবাঞ্ছিত গর্ভাবস্থা তৈরি হতে পারে। এর থেকে অনেক কিছু হতে পারেঃ
১। পরিকল্পনা বিহীন গর্ভাবস্থাঃ এর থেকে মানসিক, আর্থিক ও সামাজিক সমস্যার সম্মুখীন হওয়ার ঝুঁকি।
২। কার্যকরী গর্ভনিরোধক পদ্ধতি নিতে দেরি হয়ে যাওয়াঃ গর্ভাবস্থা এবং যৌন সংক্রামিত রোগ বা সেক্সুয়ালি ট্র্যান্সমিটেড ইনফেকশন (এসটিআই)র ঝুঁকি বাড়ায়।
৩। স্বাস্থ্য সমস্যাঃ অত্যধিক মাত্রায় পেঁপে খেলে, বিশেষ করে কাঁচা, গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সমস্যা বা অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।
গর্ভাবস্থায় পেঁপে খাওয়া কী নিরাপদ?
গর্ভাবস্থায় পেঁপে খাওয়া নিরাপদ হতে পারে, তবে হলুদ খোসা যুক্ত পাকা পেঁপে বেছে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। পাকা পেঁপেতে প্রচুর পরিমাণে বিটা-ক্যারোটিন, কোলিন, ফাইবার, ফোলেট, পটাসিয়াম এবং ভিটামিন এ, বি এবং সি থাকে। গর্ভাবস্থায় এগুলি খুব উপকারী। তবে, কাঁচা বা আধা-পাকা পেঁপে যাদের খোসা সবুজ বা সবজে হলুদ সেগুলি এড়িয়ে চলতে হবে। এর কারণ হল এতে থাকে ল্যাটেক্স ও প্যাপেইন যা থেকে জরায়ুর সংকোচন হতে পারে এবং এর থেকে সময়ের আগে প্রসবের দিকে নিয়ে যেতে পারে। কাঁচা পেঁপে থেকে মেমব্রেন যা ভ্রূণকে রক্ষা করে তা পাতলা হয়ে যেতে পারে এবং এটি একটি সাধারণ অ্যালার্জেন। গর্ভাবস্থায় আপনি স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য আপনার ডাক্তারের সঙ্গে ডায়েট নিয়ে আলোচনা করা সবচেয়ে ভাল।

আমরা গর্ভাবস্থায় পেঁপে সম্পর্কে মতামতের জন্য গুরগাঁওয়ের সিকে বিড়লা হাসপাতালের সিনিয়র গাইনোকোলজিস্ট এবং প্রসূতি বিশেষজ্ঞ বা অবস্টেট্রিশিয়ান ডাঃ অরুণা কালরার সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তিনি জানান, “পেঁপে খেলে তা থেকে গর্ভপাত হয় না।“ ডাঃ কালরা গর্ভাবস্থায় পেঁপে খাওয়া নিয়ে যে সমস্ত মিথ প্রচলিত আছে তা জোর দিয়ে নস্যাৎ করে দিয়েছেন। আমরা আবার উল্লেখ করতে চাই, কাঁচা বা আধা-পাকা পেঁপে গর্ভাবস্থায় ভালো প্রভাব ফেলতে নাও পারে। তবে, গর্ভাবস্থায় পাকা পেঁপে খাওয়া নিরাপদ। শুধু সীমিত পরিমাণে সেটা মনে রাখবেন।

মুম্বাইয়ের মাসিনার প্রিন্স আলি খান হাসপাতালের কনসালটেন্ট এন্ডোক্রিনোলজিস্ট, ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ, এবং মেটাবলিক সুপার স্পেশালিস্ট ডাঃ আলতামাশ শেখ বলেন, ”বিভিন্ন সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যে, বিভিন্ন রকমের খাদ্যতালিকাগত সীমাবদ্ধতা গর্ভাবস্থার সাথে যুক্ত করা হয়েছে। গর্ভাবস্থার ক্ষেত্রে পেঁপে খাওয়া প্রায়ই আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। কাঁচা পেঁপে খাওয়া গর্ভাবস্থার সাথে জড়িত কিছু হরমোনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে এবং জরায়ু সংকোচনের দিকে নিয়ে যেতে পারে, তবুও এর প্রভাব সাধারণত গর্ভপাতের জন্য যথেষ্ট হয়।” কার্যকর গর্ভনিরোধক পদ্ধতি সম্পর্কে নিজেকে শিক্ষিত করে এবং মিথের উপর নির্ভর না করে, আপনি আপনার প্রজনন স্বাস্থ্যবিধিকে আরও ভালভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, অবাঞ্ছিত গর্ভধারণ প্রতিরোধ করুন। সঠিক তথ্য এবং নিরাপদ নিয়মকানুন মেনে চলার জন্য সবসময় আপনার গায়নোকোলজিষ্টের সাথে পরামর্শ করুন।
Disclaimer: Medical Science is an ever evolving field. We strive to keep this page updated. In case you notice any discrepancy in the content, please inform us at [email protected]. You can futher read our Correction Policy here. Never disregard professional medical advice or delay seeking medical treatment because of something you have read on or accessed through this website or it's social media channels. Read our Full Disclaimer Here for further information.

