সারমর্ম
সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকেই ‘হারবাল’ পণ্য বিক্রি করে বলে, এগুলো খেলে চোখ ভালো হয়ে যাবে এবং চশমা আর লাগবে না। আমাদের ফ্যাক্ট-চেকে দেখা গেছে, এই দাবি বেশিরভাগই ভুল।

দাবি
একটি ফেসবুক পোস্টে বলা হচ্ছে, এই পণ্য খেলে চোখের সমস্যা ভালো হয়ে যায়, দৃষ্টি পরিষ্কার হয় এবং চশমা আর লাগে না। আমাদের শেষবার দেখার সময় পোস্টটি ৫.৮ মিলিয়ন মানুষ দেখেছে এবং ৪১ হাজার মানুষ লাইক করেছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন আরও অনেক পোস্ট আছে। আরেকটি পোস্টে ‘I-Lite’ নামে একটি পণ্যকে চোখের দৃষ্টি বাড়ানো ও নানা চোখের রোগ ভালো করার দাবি করা হয়েছে।
এই পণ্যগুলোর বেশিরভাগই নিজেদের ‘হারবাল’ বলে। তারা বলে, ভেষজ উপাদান চোখের সমস্যা সারাতে সাহায্য করে। ‘Amar Netram’-এর নিজস্ব ওয়েবসাইট আছে, আর I-Lite কিনতে হোয়াটসঅ্যাপে অর্ডার করতে বলা হয়।
সত্যানুন্ধান
চোখের রোগ কেন হয়? একটি ওষুধ কি সব ধরনের চোখের রোগ সারাতে পারে?
না। চোখের রোগ চোখের ,নানা সমস্যার কারণে হতে পারে। ছানি, গ্লুকোমা ও ম্যাকুলার ডিজেনারেশন চোখের কিছু বড় রোগ। এছাড়া ডায়াবেটিসের মতো দীর্ঘদিনের শারীরিক সমস্যার কারণেও চোখের সমস্যা হতে পারে। ধুলো বা পরাগের মতো বাইরের কারণ থেকেও অ্যালার্জি বা চোখে সংক্রমণ হতে পারে।
সব চোখের সমস্যা বিপজ্জনক না হলেও, কিছু ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা দরকার হয়। তাই একটি ওষুধ সব ধরনের চোখের রোগ সারাতে পারবে-এমনটা বিশ্বাস করার কারণ নেই। এসব পোস্টে কোথাও বলা হয়নি, পণ্যগুলো ঠিক কোন চোখের সমস্যার জন্য। এতে ভুল ধারণা তৈরি হয় যে যেকোনো চোখের সমস্যায় সবাই উপকার পাবেন।

চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. প্রদীপ দাহালে, এমএস, ডিএনবি জানান, “চোখের দৃষ্টি ঠিক করার জন্য চক্ষু বিশেষজ্ঞ বা অপ্টোমেট্রিস্ট চশমা দেন। সাধারণত চোখের গঠনের ভিন্নতার কারণে দৃষ্টির সমস্যা হলে চশমা ব্যবহার করা হয়। ব্যায়াম, আই ড্রপ বা খাদ্য সাপ্লিমেন্ট চোখের গঠন, যেমন চোখের দৈর্ঘ্য বা কর্নিয়ার বাঁক, বদলাতে পারে না। তাই স্বাভাবিকভাবে এসব দিয়ে দৃষ্টি পুরো ঠিক হয়ে যাবে—এমনটা ভাবা ভুল।”

ফর্টিস হাসপাতাল গুরগাঁওয়ের সিনিয়র সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. নেহা রাস্তোগি পান্ডা বলেন, “অ্যালার্জি, ধুলোবালি বা নোংরা হাতে চোখ ঘষার মতো অস্বাস্থ্যকর অভ্যাসের কারণে চোখের সমস্যা হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে সংক্রমণ এড়াতে দ্রুত চিকিৎসা দরকার। প্রমাণহীন উপায়ের ওপর ভরসা করা ক্ষতিকর হতে পারে। চোখ ভালো রাখতে ও সঠিক চিকিৎসার জন্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ এবং বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত চিকিৎসা খুবই জরুরি।”

চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. নবীন গুপ্তা, ডিএনবি (অফথ্যালমোলজি) বলেন, “‘চোখের স্বাস্থ্যের জন্য ভালো’ আর ‘দৃষ্টিশক্তি বাড়াতে পারে’—এই দুই কথার মধ্যে পার্থক্য বোঝা খুব জরুরি, কারণ এগুলো নিয়ে অনেক সময় বিভ্রান্তি হয়। স্বাস্থ্যকর খাবার ও ভালো জীবনযাপন চোখ ভালো রাখতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু তা সবসময় এমন নয় যে চশমার পাওয়ার কমিয়ে দেবে বা দৃষ্টি অনেকটা বাড়িয়ে দেবে। তাই এ ধরনের দাবি করা ঠিক নয়। বরং সঠিক খাবার ও স্বাস্থ্যকর অভ্যাসের মাধ্যমে চোখের ভালো যত্ন নেওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ, যা চোখের নানা সমস্যা প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে।”
হারবাল পণ্য কি সব ধরনের চোখের সমস্যা সারাতে বেশি কার্যকর?
না। এ ধরনের অনেক পণ্য ত্রিফলা, সপ্তামৃত লৌহ, যষ্টিমধুর মতো ভেষজ উপাদানের কার্যকারিতার দাবি করে। ত্রিফলা, সপ্তামৃত লৌহ বা যষ্টিমধু থাকা সাপ্লিমেন্ট চোখের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে, কিন্তু এগুলো সব ধরনের দৃষ্টিজনিত সমস্যা সারাবে,এমন নিশ্চয়তা নেই।
মায়োপিয়া (কাছের জিনিস ভালো দেখা), হাইপারোপিয়া (দূরের জিনিস ভালো দেখা), অ্যাস্টিগম্যাটিজমসহ বিভিন্ন দৃষ্টিজনিত সমস্যা জটিল এবং নানা কারণে হতে পারে। তাই ভেষজ সাপ্লিমেন্ট কতটা কাজ করবে, তা ব্যক্তি ও সমস্যার কারণের ওপর নির্ভর করে।
ত্রিফলা, সপ্তামৃত লৌহ বা যষ্টিমধুর মতো কিছু ভেষজ উপাদান চোখের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী বলে মনে করা হয়, কিন্তু এগুলো সব ধরনের দৃষ্টির সমস্যা সারায়-এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
ত্রিফলা স্বাস্থ্য ভালো রাখতে ও কিছু রোগে উপকারী হতে পারে। এতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট গুণ আছে, তাই ছানির ক্ষেত্রে এটি সহায়ক হতে পারে বলে ধারণা করা হয়। কিছু গবেষণায় মায়োপিয়ায় সপ্তামৃত লৌহ ও যোগচর্চার পর কিছু উন্নতির কথাও বলা হয়েছে।
এছাড়া যষ্টিমধু ড্রাই আই সিনড্রোমে কিছু উপকার করতে পারে বলেও কিছু গবেষণায় উল্লেখ আছে, যা দৃষ্টিতে আরাম দিতে পারে।
তবে এসব ফলাফল নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করতে আরও বড় পরিসরে, প্লাসেবো-নিয়ন্ত্রিত বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রয়োজন।
চোখের সমস্যা সারাতে আয়ুর্বেদ কী বলে?

আয়ুর্বেদ বিশেষজ্ঞ ডা. অন্নুসুইয়া গোহিল বলেন, “ত্রিফলা, সপ্তামৃত লৌহ ও যষ্টিমধু চোখের দৃষ্টিসংক্রান্ত সমস্যায় সম্ভাব্য উপকারের জন্য আয়ুর্বেদে পরিচিত। এগুলো বহুদিন ধরে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে ভালো ফলও দেখা গেছে। তবে এগুলো সম্পূর্ণভাবে চোখের সমস্যা সারাবে বা চশমার প্রয়োজন পুরো তুলে দেবে কি না, তা ব্যক্তি ভেদে আলাদা হতে পারে।
আয়ুর্বেদে ‘নিদান’ বা সমস্যার মূল কারণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। রোগ কতটা এগিয়েছে এবং এর পেছনের কারণ কী-এসব বিষয় চিকিৎসার ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তবে আয়ুর্বেদ সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও সুস্থতার ওপর জোর দেয়। শুধু ওষুধের ওপর নির্ভর করাই যথেষ্ট নয়, কারণ মূল কারণ ঠিকভাবে সামলানো না হলে সমস্যা আবার ফিরে আসতে পারে। খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাপন, চোখের যত্নের অভ্যাস এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্য-এসবও কার্যকর চিকিৎসায় সমান গুরুত্বপূর্ণ।”

অমৃতা স্কুল অব আয়ুর্বেদের শালাক্য তন্ত্র বিভাগের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ডা. কে. শিববালাজি বলেন, “সঠিক রোগ নির্ণয় ছাড়া আয়ুর্বেদে চোখের রোগের চিকিৎসা বা ওষুধ দেওয়া কঠিন। আয়ুর্বেদে চোখের চিকিৎসার পদ্ধতি অনেক ক্ষেত্রে একই হতে পারে, কিন্তু কোন ওষুধ ব্যবহার হবে তা রোগভেদে আলাদা। যেমন, চশমা বিভিন্ন কারণে লাগতে পারে, তাই চিকিৎসাও আসল কারণের ওপর নির্ভর করবে।
সেই কারণে সব ধরনের চোখের সমস্যার জন্য একটি ওষুধ কার্যকর—এমনটা সম্ভব নয়। আয়ুর্বেদেরও কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। বিশেষ করে প্রদাহজনিত চোখের সমস্যায় অনেক সময় আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা উপযুক্ত নাও হতে পারে। তাই বৈদ্যের পরামর্শ ছাড়া নিজে নিজে ওষুধ খাওয়া ক্ষতিকর হতে পারে।”
এ ধরনের উপায়ের ওপর ভরসা করা কেন উপকারের চেয়ে বেশি ক্ষতি করতে পারে?
শুধু ভেষজ বা বিকল্প চিকিৎসার ওপর নির্ভর করা ক্ষতিকর হতে পারে, কারণ এগুলোর কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা নিয়ে সবসময় বৈজ্ঞানিক প্রমাণ থাকে না। চোখের সমস্যার পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে, যার মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা খুব জরুরি। প্রমাণহীন উপায়ে ভরসা করে সঠিক রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা দেরি হলে সমস্যা বাড়তে পারে, এমনকি স্থায়ী ক্ষতিও হতে পারে।
এছাড়া ভেষজ সাপ্লিমেন্ট অনেক সময় অন্য ওষুধের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া করতে পারে বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। সবার সমস্যা একরকম নয়, তাই ব্যক্তিভেদে সঠিক চিকিৎসাও আলাদা হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও (WHO) জানিয়েছে, ভেষজ ওষুধের নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য বিষয়। বিশেষ করে অন্য ওষুধের সঙ্গে একসঙ্গে ব্যবহার করলে, চিকিৎসকের নজরদারি ছাড়া ক্ষতিকর প্রভাব হতে পারে।

চোখের ডাক্তার ডা. আফতাব আলম বলেন, “কোনো পণ্যই ম্যাজিকের মতো চশমা পুরো বন্ধ করে দিতে পারে না। কিছু উপাদান চোখ ভালো রাখতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু চশমা আর লাগবে না- এমন কথা ঠিক নয়। তাই শুধু জনপ্রিয় দেখে কোনো দাবি সত্যি ধরে নেওয়া উচিত নয়।”
আমরা এসব কোম্পানির ওয়েবসাইটে দেখে পণ্যের সঠিক ব্যবহার বা সতর্কতার স্পষ্ট তথ্য পাইনি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কোনো লাইসেন্স, সার্টিফিকেট বা বৈজ্ঞানিক গবেষণার প্রমাণও ছিল না। CTRI-তেও এই পণ্যগুলোর ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের তথ্য মেলেনি। কোম্পানিগুলোর কাছে প্রশ্ন পাঠানো হলেও এখনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
চোখে সমস্যা হলে নিজে নিজে এসব পণ্যের ওপর ভরসা না করে চোখের ডাক্তার বা চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে ভালো। সঠিক কারণ জেনে তারা প্রয়োজন অনুযায়ী চশমা, ওষুধ বা অন্য চিকিৎসা দিতে পারবেন।
Disclaimer: Medical Science is an ever evolving field. We strive to keep this page updated. In case you notice any discrepancy in the content, please inform us at [email protected]. You can futher read our Correction Policy here. Never disregard professional medical advice or delay seeking medical treatment because of something you have read on or accessed through this website or it's social media channels. Read our Full Disclaimer Here for further information.
