সারমর্ম
একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে দাবি করা হয়েছে, ঘি এবং পিতলের বাটি দিয়ে পায়ে মালিশ করলে শরীরের টক্সিন বের হয়ে যায় এবং এটি স্বাস্থ্যের জন্য খুব উপকারী। এতে অ্যাসিডিটি কমে ও শরীর ঠান্ডা হয়। আমরা এই বিষয়ে বিস্তারিত ফ্যাক্ট চেক করেছি এবং দেখেছি যে এই দাবি বেশিরভাগটাই ভুল।

সত্যানুন্ধান
একটি আর্টিকেলে দাবি করা হয়েছে, পিতলের বাটিকে ঘিয়ে ডুবিয়ে পায়ে মালিশ করলে শরীর থেকে টক্সিন বেরিয়ে যায়, অ্যাসিডিটি ও শরীরের অতিরিক্ত তাপ কমে, ঘুম ভালো হয় এবং নার্ভের শেষ প্রান্তগুলো পুষ্টি পায়। এই পদ্ধতিকে বলা হয় পদাভ্যঙ্গ (Padabhyanga)। আর্টিকেলে বলা হয়েছে, মালিশের পর ত্বকে যে কালচে দাগ পড়ে, সেটাই টক্সিন বেরিয়ে আসার প্রমাণ। অনেক পোস্ট এ আবার পিতলের বদলে তামা ব্যবহার এর কথা বলা হয়েছে ।অনেকে আবার কাঁসা ব্যবহার এর কথা বলেছে ।
পদাভ্যঙ্গের উপকারিতা কী কী?
পদাভ্যঙ্গ একটি বাস্তব আয়ুর্বেদিক পদ্ধতি, তবে এর উপকারিতা সীমিত। পদাভ্যঙ্গ হলো একটি আয়ুর্বেদিক পায়ের মালিশ পদ্ধতি, যেখানে সাধারণত ঘি বা তেল ব্যবহার করে শরীরকে শিথিল করা হয়। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, এটি পায়ের চাপ-পয়েন্টে কাজ করে মানসিক চাপ কমাতে, ঘুম ভালো করতে এবং শরীরকে আরাম দিতে সাহায্য করতে পারে।
তবে, উষ্ণ ঘি এবং পিতলের বাটি ব্যবহার করে শরীর থেকে টক্সিন, অ্যাসিডিটি বা অতিরিক্ত তাপ বের করে দেওয়ার যে দাবি করা হয়, তার পেছনে কোনও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। পিতলের বাটি দিয়ে মালিশ করলে যে আরাম পাওয়া যায়, তা মূলত মালিশের কারণে, কোনো ডিটক্স প্রক্রিয়ার জন্য নয়।

ইন্দোরের আয়ুর্বেদিক বিশেষজ্ঞ ডা. মুসকান ঠাকুর বলেন, “পদাভ্যঙ্গ শুধুমাত্র একটি আরামদায়ক প্রথা নয়, এর উপকারিতা আরও গভীর। নিয়মিতভাবে, বিশেষ করে ঘুমানোর আগে এটি করলে, এটি নার্ভাস সিস্টেমকে শান্ত করে, রক্ত সঞ্চালন বাড়ায় এবং ঘুমের মান উন্নত করতে সাহায্য করে।
আয়ুর্বেদে বিশ্বাস করা হয়, পা শরীরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ শক্তির পথের সঙ্গে জড়িত। উষ্ণ ভেষজ তেল দিয়ে পায়ে হালকা মালিশ করলে সেই শক্তির পথগুলো সক্রিয় হয়, দোষগুলোর (ভাতা, পিত্ত, কফ) ভারসাম্য ঠিক থাকে, ত্বক ও স্নায়ু পুষ্টি পায়। এতে ক্লান্তি কমে, মানসিক চাপ কমে, পায়ের জড়তা বা শক্তভাব দূর হয় এবং চোখের চাপও কিছুটা উপশম হয়। পদাভ্যঙ্গ সহজ হলেও শরীর ও মন ভালো রাখতে অনেক উপকার করে।”
পিতলের মতো ধাতু কি ত্বকের মাধ্যমে শরীরের বিষাক্ত পদার্থ (টক্সিন) বের করে দিতে পারে?
না, পিতল বা রূপার মতো ধাতু ত্বকের মাধ্যমে শরীর থেকে টক্সিন বের করতে পারে না। ত্বক মূলত একটি সুরক্ষামূলক স্তর হিসেবে কাজ করে এবং ডিটক্সিফিকেশনে এর ভূমিকা খুবই সীমিত, প্রধানত ঘামের মাধ্যমে। তবে বেশিরভাগ টক্সিন এইভাবে বের হয় না। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, শরীরের ডিটক্সিফিকেশন প্রক্রিয়া মূলত লিভার ও কিডনির মাধ্যমে হয়, ত্বকের মাধ্যমে নয়। পিতল, যা তামা ও টিনের মিশ্রণ, টক্সিন বের করার কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণিত ক্ষমতা রাখে না। ধাতুর মাধ্যমে শরীরের দূষিত পদার্থ বের করার যে দাবি করা হয়, তা বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ ছাড়া এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রহণযোগ্য নয়।

নবি মুম্বাইয়ের জেনারেল ফিজিশিয়ান ডা. আলমাস ফাতমা বলেন, “পিতল বা রূপার মতো ধাতু ত্বকের মাধ্যমে শরীর থেকে টক্সিন বের করে দিতে পারে— এমন কোনও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। এই ধারণা শুনতে ভালো লাগলেও, এটি মানব শরীরের প্রকৃত কাজ করার পদ্ধতির সঙ্গে মেলে না। ডিটক্সিফিকেশনের মূল কাজ করে লিভার, কিডনি এবং অন্ত্র। ত্বক আমাদের শরীরের একটি সুরক্ষামূলক স্তর, কোনো ডিটক্স টুল নয়। ধাতু ত্বকে ঘষলে বা মালিশের সময় ব্যবহার করলে আরাম লাগতে পারে ঠিকই, কিন্তু এতে টক্সিন বা অ্যাসিডিটি শরীর থেকে বের হবে না। এই ধরনের দাবি বিভ্রান্তিকর এবং সাবধানে বিবেচনা করা উচিত।”
ত্বকে যে কালচে দাগ পড়ে, সেটা কি টক্সিনের প্রমাণ?
না, ত্বকে যে কালচে দাগ পড়ে, তা টক্সিনের প্রমাণ নয়। পিতলের বাটি দিয়ে মালিশ করার পরে যে দাগ দেখা যায়, তা সাধারণত ঘি, মৃত ত্বকের কোষ, ধুলোমাটি, কিংবা পিতলের অক্সিডেশনের ফলে তৈরি হয়। পিতল ঘাম বা তেলের সঙ্গে বিক্রিয়া করে একটি কালচে স্তর তৈরি করতে পারে, কিন্তু এটি টক্সিন বের হওয়ার লক্ষণ নয়। শরীর এইভাবে ত্বকের মাধ্যমে টক্সিন বের করে না, এবং এমন কোনো বৈজ্ঞানিক গবেষণা নেই যা বলে এই দাগ ডিটক্সিফিকেশনের প্রমাণ।
এই রকমই কিছু দাবি দেখা যায়, যেমন—গরুকে ছোঁয়া মাত্র শরীরের সব টক্সিন নাকি বেরিয়ে যায়, কিংবা বাঁ দিকে শুলেই শরীর থেকে সব টক্সিন বেরিয়ে যায়—এসব দাবিও মিথ্যা।
সারাংশে বলা যায়, ঘি ও পিতল দিয়ে পায়ে মালিশ করলে টক্সিন বেরিয়ে যায়—এই দাবি বেশিরভাগটাই ভুল। আয়ুর্বেদিক পায়ের মালিশ বা পদাভ্যঙ্গ শরীরকে আরাম দিতে ও ঘুম ভালো করতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু এটি শরীর থেকে টক্সিন, অ্যাসিডিটি বা তাপ বের করে দেয়—এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। ঘি ত্বককে ময়েশ্চারাইজ করতে পারে ঠিকই, কিন্তু এটি স্নায়ুপ্রান্তে পুষ্টি দেয়—এই দাবিও প্রমাণিত নয়।
ডিটক্সিফিকেশন মূলত হয় লিভার ও কিডনির মাধ্যমে, পায়ে কাঁসার বাটি দিয়ে মালিশের মাধ্যমে নয়। আরাম পেতে হলে যেকোনো নিরাপদ তেল দিয়ে সাধারণ পায়ের মালিশ করলেই অনেক উপকার পাওয়া যায়—ভুলভাল দাবির প্রয়োজন নেই।
Disclaimer: Medical Science is an ever evolving field. We strive to keep this page updated. In case you notice any discrepancy in the content, please inform us at [email protected]. You can futher read our Correction Policy here. Never disregard professional medical advice or delay seeking medical treatment because of something you have read on or accessed through this website or it's social media channels. Read our Full Disclaimer Here for further information.

